Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / রংপুর বিভাগ / সারাদেশ / ঠাকুরগাঁও / ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইন জুয়ার ফাঁদে নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার - Chief TV

ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইন জুয়ার ফাঁদে নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার - Chief TV

2026-09-11  ডেস্ক রিপোর্ট  35 views
ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইন জুয়ার ফাঁদে নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার - Chief TV

ঠাকুরগাঁওয়ে দিন দিন বাড়ছে অনলাইন জুয়ার বিস্তার। শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন অনলাইন বেটিং ও জুয়ার প্ল্যাটফর্মে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। রাতারাতি অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার আশায় শুরু হওয়া এই আসক্তি অনেকের জীবনে ডেকে আনছে আর্থিক সংকট, পারিবারিক অশান্তি ও মানসিক বিপর্যয়।

সাইবার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্মার্টফোনের মাধ্যমে সহজেই এসব অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শুরুতে অল্প অঙ্কের অর্থ জেতানোর মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করা হয়। পরে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়। একপর্যায়ে অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন, কেউ জমি-জমা বা বসতবাড়ি বিক্রি করেও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নেমে আসে নানা সংকট।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ছিল আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। এ উপলক্ষে ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইন জুয়ার কারণে অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে পড়ে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া কয়েকজনের পরিবার, স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে অনলাইন জুয়ার ভয়াবহ প্রভাবের চিত্র উঠে এসেছে।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার হরিহরপুর নয়াপাড়ার ব্যবসায়ী মনির হোসেন চলতি বছরের এপ্রিল মাসে অনলাইন জুয়ায় বড় অঙ্কের অর্থ হারানোর পর আত্মহত্যা করেন। তার স্বজনদের দাবি, একটি অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মে অর্থ হারিয়ে তিনি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন।

 

onlinegambling2-930a9e.jpg

 

এর আগে জানুয়ারি মাসে পৌর শহরের পূর্ব হাজীপাড়ার সাদেকুল ইসলাম বসতবাড়ি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন বলে পরিবার জানায়। পরে তিনিও আত্মহত্যা করেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মহিশমারী গ্রামের আকরাম আলী অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হয়ে মারা যান বলে স্বজনদের দাবি। একই উপজেলার রাজিউর রহমান রাজু ২০২৪ সালের মে মাসে কয়েক মাসের মধ্যে বিপুল অর্থ হারানোর পর আত্মহত্যা করেন বলেও জানা গেছে।

এক প্রতিবেশীকে অনলাইন জুয়ায় অর্থ হারিয়ে নিঃস্ব হতে দেখেছেন আব্দুর জব্বার। তিনি বলেন, শুরুতে কয়েকবার জেতানো হয়। এতে আগ্রহ বাড়তে থাকে। পরে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করলে লোকসান শুরু হয়। অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন, সংসারে অশান্তি দেখা দেয় এবং কেউ কেউ জমি-সম্পত্তি বিক্রি করেও জুয়ার আসক্তি থেকে বের হতে পারেন না।

সাইবার সংশ্লিষ্টদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন বার্তাভিত্তিক গোপন গ্রুপের মাধ্যমে স্থানীয় এজেন্টরা নতুন খেলোয়াড় সংগ্রহ করেন। অল্প অর্থে লাভের সুযোগ দেখিয়ে ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। হারানো অর্থ ফেরত পাওয়ার আশায় অনেকে আরও অর্থ ঢালতে থাকেন। এভাবেই তৈরি হয় ঋণ, পারিবারিক কলহ ও মানসিক চাপের একটি চক্র।

অভিযোগ রয়েছে, মাঝেমধ্যে স্থানীয় এজেন্ট বা জুয়ার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মূল নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিদেশি সার্ভারনির্ভর বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য মূল নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের ঠাকুরগাঁও জেলা সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, গত এক থেকে দুই বছরে জেলায় অনলাইন জুয়ার প্রবণতা বেড়েছে। প্রশাসনের একার পক্ষে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

জেলা পুলিশের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ে অনলাইন জুয়া নিয়ে সাইবার সুরক্ষা আইনে চারটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া জুয়া প্রতিরোধ আইনে সাতটি মামলায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহাজান খান বলেন, জেলায় অনলাইন জুয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের অনলাইন জুয়ার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে।

অনলাইন জুয়ার কারণে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নাহিদ ইসলামের জীবনও বদলে যায় বলে তার পরিবার জানায়। ২০২৩ সালে বিয়ে করে সন্তানসহ সংসার শুরু করা নাহিদ একসময় অনলাইন জুয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। প্রথমদিকে কিছু অর্থ জেতার পর তিনি আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে থাকেন। পরে একের পর এক অর্থ হারিয়ে মানসিক ও আর্থিক সংকটে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের অজান্তেই তার পরিস্থিতি ক্রমে অবনতির দিকে যায়। প্রায় দুই মাস আগে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে পরিবার জানায়।

নাহিদের মা নাজি বেগম বলেন, অনলাইন জুয়ার কারণে তার ছেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বুঝতে পারেননি। সরকারের প্রতি অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আর কোনো পরিবার যেন এমন পরিস্থিতির শিকার না হয়।

নাহিদের স্বজন খুশি মনি বলেন, নাহিদের এক বছরের একটি সন্তান রয়েছে। অনলাইন জুয়ার কারণে একটি সুখী পরিবার ভেঙে গেছে। বর্তমানে শিশুটিকে নিয়ে তার মা বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, ঘরে বসে মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে সন্তান কখন অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তা অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন না। ফলে শুরুতেই বিষয়টি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকে একযোগে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।


Share: