Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
হোম / ময়মনসিংহ বিভাগ / সারাদেশ / ময়মনসিংহ / উচ্চ বেতনের প্রলোভন থেকে যুদ্ধের ময়দান, রাশিয়ায় গিয়ে ফিরলেন না মামুন - Chief TV

উচ্চ বেতনের প্রলোভন থেকে যুদ্ধের ময়দান, রাশিয়ায় গিয়ে ফিরলেন না মামুন - Chief TV

2026-09-11  ডেস্ক রিপোর্ট  56 views
উচ্চ বেতনের প্রলোভন থেকে যুদ্ধের ময়দান, রাশিয়ায় গিয়ে ফিরলেন না মামুন - Chief TV

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার খারুয়া গ্রামের আল মামুনের বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন এখন পরিবারে পরিণত হয়েছে শোকে। ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরি করে ভালো আয় করবেন, পরিবারের ঋণ শোধ করবেন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়বেন—এমন স্বপ্ন নিয়ে গত ৭ মে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন ২৪ বছর বয়সী মামুন। পরিবারের অভিযোগ, চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়ার পর তাকে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। পরে যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন।

মামুনের পরিবারের কাছে তার সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন হোসেন মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন। তবে মামুন ঠিক কখন ও কোথায় মারা গেছেন কিংবা তার মরদেহ কোথায় রয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি পরিবার।

মামুন ছিলেন মৃত আবুল কাশেম ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির একমাত্র ছেলে। স্ত্রী মহিমা আক্তার, চার বছর বয়সী এক ছেলে ও পাঁচ মাস বয়সী এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তার সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে মামুনের আয়ের ওপরই নির্ভরশীল ছিল পুরো পরিবার।

পরিবার জানায়, বিদেশে যাওয়ার আগে মামুন স্ত্রীকে বলেছিলেন, দুই-তিন বছর কাজ করে ঋণ পরিশোধ করবেন। এরপর বাড়িতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই তার মৃত্যুর খবর এসেছে।

মামুনের স্ত্রী মহিমা আক্তার বলেন, তার স্বামী যুদ্ধ করতে রাশিয়ায় যাননি। ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের কথা বলেই তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। রাশিয়ায় যাওয়ার পরও মুঠোফোনে অডিও বার্তা ও ছবি পাঠিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন মামুন।

যুদ্ধক্ষেত্রে থাকার সময় ভয় ও শঙ্কার কথাও স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন তিনি। একবার মামুন জানিয়েছিলেন, তার মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ঘুরছে এবং কখন কী ঘটে বলা যায় না। সন্তানদের দেখে রাখার কথাও স্ত্রীকে বলেছিলেন তিনি।

মহিমা জানান, গত ২৬ আগস্ট কোনোভাবে স্বামীর সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। প্রায় আট কিলোমিটার হেঁটে একটি এলাকায় গিয়ে ওয়াই-ফাই সংযোগ পাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন মামুন। এর আগে ১৯ আগস্ট একটি অডিও বার্তাও পাঠিয়েছিলেন। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

মামুনকে বিদেশে পাঠাতে পরিবারের প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া হয় ৫০ হাজার টাকা। ধানের ওপর প্রায় চার লাখ টাকা দাদন নেওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার এবং গরু বিক্রি করে বাকি অর্থ জোগাড় করা হয়।

মামুনের মা রোকেয়া খাতুন বলেন, ছেলে পরিবারের অভাব ঘোচাতে এবং সবার ভালো থাকার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন ছেলে নেই, কিন্তু ঋণের বোঝা রয়ে গেছে। সমিতির লোকজন বাড়িতে টাকা চাইতে আসছেন। দুই নাতি-নাতনিকে কীভাবে বড় করবেন, সেটিই এখন তার সবচেয়ে বড় চিন্তা। যারা চাকরির কথা বলে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দিয়েছেন, তাদের বিচারও দাবি করেন তিনি।

মামুনের সঙ্গে একই ফ্লাইটে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের রাজন হোসেন। তার দাবি, ‘জাবাল-এ-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে ৭ মে প্রায় ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। তাদের ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সবার ভিসা, বিএমইটি কার্ড ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ছিল বলেও জানান তিনি।

রাজনের ভাষ্য, ৮ মে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর কয়েক দিন তাদের স্বাভাবিকভাবে রাখা হয়। ১২ মে ব্যাংক কার্ড, সিম কার্ড ও কাজের অনুমতিপত্র দেওয়ার কথা বলে রুশ ভাষায় লেখা একটি চুক্তিতে তাদের স্বাক্ষর করানো হয়। পরে তারা জানতে পারেন, সেটি ছিল রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি।

এরপর তাদের একটি সেনাক্যাম্পে নিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। রাজনের দাবি, ১২ জুন তাদের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। ১৪ জুন ড্রোন হামলা ও মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় তাদের দলের অন্তত ১৭ বাংলাদেশি নিহত হন। আরও কয়েকজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

ওই হামলায় রাজন নিজেও আহত হন। পরে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে ১৮ আগস্ট বাংলাদেশ দূতাবাসে যান এবং রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতায় ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন। দেশে ফেরার পরও রাশিয়ায় থাকা সহযাত্রীদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। এক রুশভাষী কমান্ডারের কাছ থেকেই মামুনের মৃত্যুর খবর পান এবং পরে তার পরিবারকে বিষয়টি জানান।

মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তার খালা-শাশুড়ি মোসাম্মৎ কোবিলা আক্তার। তার দাবি, প্রায় দুই বছর আগে মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য কাগজপত্র দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর একটি এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা হলে গত ৭ মে তিনি রাশিয়ায় যান।

কোবিলা আক্তার বলেন, রাশিয়ায় যাওয়ার পর রুশ ভাষায় চুক্তিতে স্বাক্ষর করানোর বিষয়টি জানতে পেরে তারা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেন। তখন বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানো হবে না বলে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে রাশিয়ায় উচ্চ বেতন ও সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের পাঠানোর অভিযোগে তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জাবাল-এ-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডও রয়েছে বলে সরকারি তথ্যের বরাতে জানা গেছে।

মামুনের পরিবার জানিয়েছে, তারা একাধিকবার সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন। তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও তারা সহযোগিতা চান। নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত জানিয়েছেন, মামুনের মৃত্যুর বিষয়টি পরিবার মৌখিকভাবে জানিয়েছে। তাদের লিখিত আবেদন দিতে বলা হয়েছে। আবেদন পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।


Share: