ডিজিটাল যুগে চিকিৎসাব্যবস্থা যখন আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত অবকাঠামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনও নওগাঁর মান্দা উপজেলার পরানপুর ইউনিয়নে চিকিৎসাসেবার ভরসা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ১৯৩০ সালে নির্মিত একটি মাটির দোতলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। প্রায় ৯৬ বছরের পুরোনো ভবনটি দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণতায় এখন ঝুঁকিপূর্ণ। বহুদিন আগেই ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও সেখানে এখনো নির্মাণ হয়নি নতুন ভবন। ফলে পাশের পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের একটি ছোট কক্ষেই চলছে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম।
একসময় এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসা ছিল মাটির তৈরি ওই দোতলা ভবনটি। সময়ের সঙ্গে ভবনের দেয়াল দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে মাটির আস্তরণ খসে পড়েছে, নষ্ট হয়ে গেছে দরজা-জানালা। পুরোনো হয়ে গেছে টিনের ছাউনিও। রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও বিকল্প অবকাঠামো না থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, পরিত্যক্ত ভবনটি এখন অনেকটাই নীরব। অথচ একসময় এখানে চিকিৎসা নিতে মানুষের ভিড় লেগে থাকত। বর্তমানে ভবনটির পাশের পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের একটি ছোট কক্ষেই রোগী দেখা, ওষুধ বিতরণসহ উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২৫০ জন রোগী এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসেন। ছোট একটি কক্ষে এত বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে তৈরি হচ্ছে চরম ভোগান্তি। রোগীদের পাশাপাশি সীমিত জায়গায় কাজ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরাও।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনবল সংকট। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে পাঁচজন কর্মীর পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন। সীমিত জায়গা ও অপ্রতুল জনবল নিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
শুধু পরানপুর ইউনিয়ন নয়, মান্দা উপজেলার আরও আটটিসহ মোট নয়টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবকাঠামো নিয়ে সংকট রয়েছে। কোথাও ভবন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ, আবার কোথাও প্রয়োজনীয় কক্ষ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। এতে উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভোগান্তি বাড়ছে।
পরানপুরের এই জরাজীর্ণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিষয়টি সম্প্রতি জাতীয় সংসদেও আলোচনায় আসে। নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপু জাতীয় সংসদে মাটির তৈরি জরাজীর্ণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ছবি প্রদর্শন করে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
ডা. ইকরামুল বারী টিপু বলেন, ১৯৩০ সালে নির্মিত জরাজীর্ণ মাটির ভবনে সাধারণ মানুষকে চিকিৎসাসেবা নিতে হয়েছে, যা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত দুঃখজনক। মান্দার নাজুক উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো আধুনিকায়নের পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দা মোছা. হামেদা বলেন, আগে মাটির ভবনটিতেই চিকিৎসাসেবা পাওয়া যেত। এখন ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে আর চিকিৎসা দেওয়া হয় না। দূর-দূরান্ত থেকে এসে ছোট একটি ঘরে গাদাগাদি করে লাইনে দাঁড়িয়ে ওষুধ নিতে হয়। এতে তাদের অনেক কষ্ট হয়।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল জলিল বলেন, আধুনিক যুগে এসেও এমন পুরোনো মাটির স্বাস্থ্যকেন্দ্র পড়ে থাকা দুঃখজনক। দ্রুত সেখানে একটি আধুনিক ও স্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
পরানপুর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, মাটির ভবনটি বহুদিন আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তাই পাশের পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের একটি কক্ষেই রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে। পাঁচজনের জায়গায় বর্তমানে মাত্র দুজন কর্মরত রয়েছেন। প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২৫০ জন রোগীকে একটি ছোট কক্ষে সেবা দেওয়া খুবই কঠিন।
মান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মাহবুব-উল আলম জানান, জরাজীর্ণ উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর বিষয়ে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ইতোমধ্যে জমি মাপজোখ ও সীমানা নির্ধারণের কাজ করেছে। পরানপুরসহ উপজেলার নয়টি জরাজীর্ণ উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রেই নতুন ও আধুনিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুতই এসব ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।