Chief TV - Leading online news portal of Bangladesh.

collapse
Home / রাজশাহী বিভাগ / সারাদেশ / নওগাঁ / ছয় দশক ধরে সংবাদপত্রের সঙ্গে জাকের আলী পথচলা - Chief TV

ছয় দশক ধরে সংবাদপত্রের সঙ্গে জাকের আলী পথচলা - Chief TV

2026-09-17  উজ্জ্বল কুমার, নওগাঁ প্রতিনিধি  27 views
ছয় দশক ধরে সংবাদপত্রের সঙ্গে জাকের আলী পথচলা - Chief TV

নওগাঁ শহরের মন্ডলপাড়ার বাসিন্দা জাকের আলী। বয়স প্রায় ৭৫ বছর। ছয় দশক ধরে সংবাদপত্রের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত দীর্ঘ এই পথচলায় সংবাদপত্র বিক্রির পেশাকে শুধু জীবিকার মাধ্যম হিসেবে নয়, নিজের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই ধরে রেখেছেন তিনি।

নওগাঁ শহরের সরকারি খাদ্য বিভাগের গোডাউনের পেছনের এলাকায় এখনো নিয়মিত দেখা মেলে জাকের আলীর। ভোরের আলো ফোটার আগেই ফজরের নামাজ শেষ করে কাজে বসেন তিনি। সকাল থেকে বেলা ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত হকারদের হাতে সংবাদপত্র তুলে দেন। বয়সের ভার এলেও পেশার প্রতি তার নিষ্ঠায় যেন কোনো ভাটা পড়েনি।

সংবাদপত্রের জগতে জাকের আলীর হাতেখড়ি হয়েছিল নওগাঁর বরেণ্য সংবাদপত্র এজেন্ট আব্দুল জলিলের কাছে। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জন করে একসময় নিজের এজেন্সি গড়ে তোলেন। শুরুর দিকে নওগাঁর কিংবদন্তি সাংবাদিক ও ইতিহাসসচেতন ব্যক্তিত্ব খান সাহেব মোহাম্মদ আফজাল তাকে দিকনির্দেশনা ও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিলেন বলে জানান জাকের আলী।

দীর্ঘ ছয় দশকের পথচলায় একসময় নওগাঁয় সংবাদপত্র শিল্পের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় তার এজেন্সির আওতায় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক ও ত্রৈমাসিক মিলিয়ে শতাধিক পত্রিকা ছিল।

জাতীয় দৈনিকের পাশাপাশি ভারতীয় বাংলা পত্রিকা ও সাময়িকীরও এজেন্সি ছিল তার। দেশ, সানন্দা ও আনন্দবাজারসহ বিভিন্ন প্রকাশনার কাগজও নওগাঁর পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। সময়ের পরিবর্তনে পাঠকসংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক পত্রিকার এজেন্সি এখন আর চালান না। তবে সংবাদপত্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখনো অটুট।

নওগাঁ শহরের বিভিন্ন জায়গায় বদলেছে তার কাজের ঠিকানা। ব্রীজের মোড়ের পুরোনো ওষুধপট্টি থেকে শুরু করে খান কনফেকশনারির সামনে টিনের দোকান, ব্রীজ মোড়ের ফুজি কালার স্টুডিও, পৌর মার্কেটের দোতলার বারান্দা, নওগাঁ গাঁজা সমবায় সমিতির বারান্দা ও সামনের খোলা আঙিনা—বিভিন্ন স্থানে সংবাদপত্র বিতরণের কাজ করেছেন তিনি। বর্তমানে গাঁজা সমবায় সমিতির পাশের মার্কেট ও নওগাঁ নওজোয়ান মাঠের বিপরীত পাশে প্রধান সড়কের পূর্ব পাশের ফুটপাতে বসে কাজ করেন।

সংবাদপত্র শিল্পের বর্তমান বাস্তবতা অবশ্য আগের মতো নেই। নেট দুনিয়ার বিস্তারের সঙ্গে মুদ্রিত সংবাদপত্রের পাঠক কমেছে। অনেক এজেন্সি বন্ধ হয়ে গেছে। তারপরও পেশার প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে জাকের আলী এখনো নিয়মিত সংবাদপত্র বিতরণের কাজ করে যাচ্ছেন।

জাকের আলীর নিজের পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। নওগাঁ এটিম মাঠসংলগ্ন ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি। সংসারের আর্থিক সংকটের কারণে এরপর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। অল্প বয়সেই জীবিকার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন সংবাদপত্রের এই পেশার মাধ্যমে।

নিজের পড়াশোনা থেমে গেলেও সন্তানদের শিক্ষিত করার স্বপ্ন থামেনি তার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দুই ছেলেকেই পড়াশোনা করিয়েছেন। বর্তমানে তার এক ছেলে চিকিৎসক এবং অন্য ছেলে স্বাস্থ্য বিভাগে চাকরি করছেন।

সহজ-সরল জীবনযাপন ও মানবিক আচরণের কারণে নওগাঁর অনেক মানুষের কাছেই জাকের আলী পরিচিত একজন আপনজন। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিত কেউ বিপদে পড়লে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। এ কারণেই স্থানীয় মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে।

সময় বদলেছে, সংবাদপত্রের জগতও বদলে গেছে। তবু ভোরের নরম আলোয় সংবাদপত্রের বান্ডিল হাতে হকারদের অপেক্ষায় থাকা জাকের আলী যেন নওগাঁর সংবাদপত্র শিল্পের এক জীবন্ত স্মৃতি। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে একই পেশায় টিকে থাকা এই মানুষটি শুধু একজন সংবাদপত্র এজেন্ট নন, বরং একটি সময়ের সাক্ষী।

সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের পরিচিতি হয়তো বড় কোনো পদ-পদবি কিংবা খ্যাতির সঙ্গে যুক্ত নয়। তবুও নিজেদের কাজ, ব্যবহার ও মানবিকতার কারণে তারা মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেন। জাকের আলীও তেমনই একজন। নওগাঁর সংবাদপত্রের ইতিহাস ও মানুষের স্মৃতির সঙ্গে যার নাম মিশে আছে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুস্থ ও ভালো থাকুন নওগাঁর এই প্রিয় মানুষটি—এমনটাই প্রত্যাশা তার পরিচিতজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের।


Share: